২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এপ্রিলের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা দিয়েছে, তবে এই সময় নির্ধারণ নিয়ে বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য এ সময়টি উপযুক্ত, কারণ এতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগ মিলবে এবং নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু বিএনপি এই সময়টিকে উপযুক্ত মনে করছে না এবং তাদের মতে, ডিসেম্বরে নির্বাচন হওয়া উচিত ছিল। বিএনপির শীর্ষ নেতারা সরকারের সময় নির্ধারণের বিরুদ্ধে কঠোর আপত্তি জানিয়েছেন। তারা দাবি করছেন, ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজন করা বেশি যুক্তিসঙ্গত হবে, কারণ এই সময় দেশের আবহাওয়া থাকে শুষ্ক এবং নির্বাচন আয়োজনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। বিএনপির মতে, এপ্রিল মাসে নির্বাচন আয়োজন করলে প্রচণ্ড গরম এবং ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এছাড়া, এপ্রিলে রোজা এবং পাবলিক পরীক্ষার কারণে নির্বাচন আয়োজন আরো কঠিন হবে। তারা মনে করে, সরকার তাদের দাবি উপেক্ষা করে তিন মাস বিলম্বের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নির্বাচনের অনিশ্চয়তা আরও বাড়াবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শুক্রবার (৬ জুন) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জানিয়েছেন, আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের মতে, এই সময় নির্বাচন আয়োজনের পেছনে রয়েছে একটি পরিকল্পিত রোডম্যাপ। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনের পূর্বে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করা হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নেওয়া হবে। এই সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে, যাতে দেশের ভবিষ্যৎ সংকটে না পড়তে হয়। বিএনপির শীর্ষ নেতারা দ্বিতীয়ভাবে বলছেন, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচনের জন্য এপ্রিল মাস ঠিক করা হলেও এটি বাজেটের প্রস্তুতি ও নতুন সরকারের গঠন প্রক্রিয়ার জন্য অনুকূল নয়। তাদের মতে, জুন মাসে বাজেট উপস্থাপন করতে হয় এবং এপ্রিলের নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন করতে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে না। বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য এক মাসের মধ্যে সময় খুবই কম, যা তারা বাস্তবসম্মত মনে করছেন না। বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের জন্য প্রাথমিকভাবে যে পরিকল্পনা ছিল, তা পরিবর্তন করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে পক্ষপাতমূলক মনোভাব রয়েছে, বিশেষ করে জামায়াত ও এনসিপির প্রতি সরকারের বিশেষ মনোভাব দেখানো হচ্ছে। বিএনপির মতে, সরকার তাদের দাবিকে উপেক্ষা করে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে, যা নির্বাচনকালকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। জামায়াত ও এনসিপি প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, "এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে জাতি আশ্বস্ত হবে।" এনসিপি এর পক্ষ থেকে তাদের সদস্যসচিব আখতার হোসেন জানিয়েছেন, যদি নির্বাচনের আগে ‘জুলাই সনদ’ ও গৃহীত সংস্কার বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তারা নির্বাচনের সময়ের বিষয়ে আপত্তি জানাবে না। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করলেও, নির্বাচন সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের একপেশে মনোভাবের প্রতিফলন। তারা মনে করছেন, মার্চ মাসের মধ্যেই রমজান এবং এপ্রিলের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকবে, যা নির্বাচনের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। এদিকে, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও এই সময় অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে, নির্বাচনের আয়োজন আরো জটিল হয়ে উঠবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সময় নির্ধারণের ফলে দেশ আবারও অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতার দিকে চলে যেতে পারে। বিশেষত, বাংলাদেশের মতো দেশে যখন ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশ প্রয়োজন, তখন এপ্রিলে নির্বাচন আয়োজন কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।