কাগজপত্রবিহীন ও চোরাই পণ্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর দিয়ে সন্ধ্যা ৬টার পর সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ করেছে। কাস্টমসের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশের প্রধান এই স্থলবন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত জুড়ে পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ জট সৃষ্টি হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক লতা বলেছেন, "কয়েকদিন আগে আমাদের সাথে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের একটি বৈঠক হয়েছিল। তারা প্রস্তাব করেছিল সন্ধ্যা ৬টার পর আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকার। আমরা বলেছি বন্দর ব্যবহারকারী সবার সাথে কথা বলে বিষয়টি জানানো হবে।" অর্থাৎ, এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বন্দর ও কাস্টমস কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাবে প্রায়ই এমন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০-২৫০ কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। সময়সীমা কমে যাওয়ায় বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বেনাপোল ও ভারতের পেট্রাপোল সীমান্তে প্রতিদিন দেড় হাজারেরও বেশি পণ্যবাহী ট্রাক আটকে থাকছে। এসব ট্রাকে দ্রুত পচনশীল পণ্য (ফল, সবজি, মাছ, কসমেটিকস, রাসায়নিক কাঁচামাল) থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকার পণ্য খালাস আটকে যাচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারও প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী আনারুল ইসলাম বলেন, পূর্ব ঘোষণা ছাড়া সন্ধ্যার পর বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করায় ব্যবসায়ীরা হতবাক। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা বিকল্প হিসেবে ভোমরা, হিলি বা সোনামসজিদমুখী হতে বাধ্য হবে, এতে সরকারের রাজস্বও কমে যাবে।
আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তিনি প্রতিদিন অন্তত ৪০০-৫০০ আমদানিমুখী ট্রাক প্রবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ভারতের পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশের এই একতরফা সিদ্ধান্তে ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং দুই দেশের বাণিজ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, "আমরা বন্দর পরিচালনা করি। তবে কাস্টমস অনুমোদন ছাড়া কোনো পণ্য ক্লিয়ার করা সম্ভব নয়। আকস্মিক এই সিদ্ধান্ত রাজস্ব এবং বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।"
এদিকে, বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালিদ মো. আবু হোসেন এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য ফোন ধরেননি। এর আগে একজন সহকারী কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তা সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলতেন, কিন্তু বর্তমানে কাস্টমস হাউজের কোনো কর্মকর্তাকেই সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
তবে কাস্টমসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সমন্বয়ের কারণে সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত সমাধান হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ১ আগস্ট দুই দেশের সিদ্ধান্তে বেনাপোল-পেট্রাপোল ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) ২৪ ঘণ্টা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে এনবিআর দেশের সব কাস্টমস হাউসকে ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশ দিলেও বেনাপোলে তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।