দেশের খবর

রাজশাহী মহানগরীতে কিশোর গ্যাং ভয়ংকর হয়ে উঠছে

ফাইল ছবি

রাজশাহী মহানগরী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহানগরীর বারোটি থানা এলাকায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। একাধিক খুনের ঘটনাও ঘটেছে। নগরীতে ইভটিজিং, চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছে কিশোর গ্যাং চক্র। এতে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে নগরীর ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। 

জানা গেছে, কয়েক বছর আগে কিশোর গ্যাং ধরতে ডাটাবেজ করে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)। সেই ডাটাবেজ অনুযায়ী সন্দেহভাজন কিশোরদের আটক করা হয়। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকের জিম্মায় দেয় পুলিশ। এছাড়া সিসিটিভি দিয়ে নগরীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অপরাধী শনাক্ত ও আটক করছিল পুলিশ। তবে ৫ আগস্ট দেশজুড়ে উদ্ভুত ঘটনার সময় নগরীর সিএন্ডবি এলাকায় আরএমপি হেডকোয়ার্টারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে সেই কিশোর গ্যাংয়ের ডাটাবেজ পুড়ে ও নষ্ট হয়ে যায়  হারিয়ে যায়।

একাধিক রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নগরীর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সাবেক নেতারা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছিলেন।

সূত্রমতে- নগরীর ভদ্রা মোড়, সিএন্ডবি, লক্ষিপুর, টিকাপাড়া (খুলিপাড়া), কেদুর মোড়, হোসনিগঞ্জ বেতপট্টি, পাঠানপাড়া, কলাবাগান, অলোকার মোড়, হেতম খা, নিউ মার্কেট, তালাইমারি, বিমান বন্দর সড়ক, গ্রেটার রোড ও সিটি বাইপাসসহ আরও অন্তত ১৫টি পয়েন্টে কিশোর গ্যাং সদস্যরা প্রকাশ্যে মোটরসাইকেলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

তথ্যমতে- গতবছরের জুলাই মাসে নগরীর বনগ্রাম গাংপাড়া এলাকায় হাঁসুয়া, চাপাতি, রামদা, চাইনিজ কুড়াল, চাকু ও ছুরিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নাচানাচি করে কিশোর গ্যাংয়ের একটি গ্রুপ। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ড্রামের বাজনার সঙ্গে সঙ্গে বুনো উল্লাস করছিল তারা। এ নিয়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে অবশ্য পুলিশ কয়েকজনকে আটক ও বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করে।

মহানগরীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকাভিত্তিক গড়ে ওঠা বিভিন্ন কিশোর গ্যাং আবারও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশের নজরদারির অভাবে নতুন নতুন গ্রুপও তৈরি হচ্ছে। ছিনতাই ও ছুরিকাঘাত যেন নিত্যদিনের ঘটনা। মোটরসাইকেল নিয়ে হচ্ছে বেশিরভাগ ছিনতাই।

গত ২১ নভেম্বর রাজশাহী মহানগর বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক ও দপ্তরের দায়িত্বে সাবেক কাউন্সিলর বজলুল হাক মন্টু ভদ্রার মোড়ে ছুরিকাহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি নিজে কয়েকবার মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বজনক কর্মকর্তাদের কাছে কিশোর গ্যং এর তথ্য  প্রদান করেছেন। তাতেও লাভ হয়নি।

মহানগরীব কুমার পাড়া মোড়ে বি আর টি সির বাস ডিপুতে হামলা চালিয়ে বিভাস কুমার প্রামাণিক কে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে মোবাইল টাকা পয়সা সহ সবকিছু চিনে নিয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

ড্রাইভার সজল উদ্দিন একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। গত ১৯ অক্টোবর বিকেলে তার স্ত্রীর কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করা হয়। পরে তারা থানায় অভিযোগ দেন। সজল বলেন, আমার স্ত্রী ও ছোটবোন দুই সন্তানকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট থেকে দাওয়াত খেয়ে আসছিলেন। রেলগেটে বাস থেকে নামার পর রিকশায় ওঠেন। গয়না ও মোবাইল পার্টস ব্যাগে রেখেছিলেন। ভদ্রার অদূরে রেশম অফিসের বিপরীত দিকে ভাঙড়িপট্টির সামনে মোটরসাইকেলে করে দুজন এসে ব্যাগটি ছিনতাই করে নিয়ে যায়। সজলের অভিযোগ, মোবাইল উদ্ধার হওয়ার পর আসামিকে আমি চিহ্নিত করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলী আকবরকে জানাই। তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে আসামি ধরছেন না, আমার ছিনতাই হওয়া জিনিসও উদ্ধার করছে না।

সর্বশেষ বুধবার ২৭ নভেম্বর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছেন ট্রান্সপরেন্সি ইন্টারন্যাশন্যাল বাংলাদেশের সদস্য প্রকৌশলী রাবেয়া বারি। তাৎক্ষণিকভাবে বোয়ালিয়া মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তিনি। রাবেয়া বারি বলেন, ভাঙড়িপট্টির সামনে মোটরইসাইকেলে করে এসে আমার ব্যাগ ছিনতাই করে দুজন ব্যক্তি। ব্যাগে দুটি এন্ড্রয়েড মোবাইল, ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড, টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল। পরে থানায় অভিযোগ করতে গেলে একটি ফোন কলে জানানো হয়, ব্যাগটি একটি জায়গায় পড়ে আছে। সেখানে গিয়ে ব্যাগ পাই। কিন্তু ফোন, টাকাপয়সা আর পাইনি। তার স্বামী জানাই একই জায়গায় দুজন কোরিয়ান নাগরিকের মোবাইল ও ল্যাপটপ ছিনতাই করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর মাসুদুর রহমান মুক্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আরও ভাল অবস্থা প্রত্যাশিত। সেটা আসেনি বা হচ্ছে না । অভিভাবকরা সচেতন হলে, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। 

এ ব্যাপারে আরএমপির একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। ডাটাবেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমরা পুরনো তালিকা নিয়ে কাজ করতে পারছি না। তবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

আরএমপি কমিশনার আবু সুফিয়ান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এই বিষয় নিয়ে  কাজ করছি।  অভিযোগ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উন্নতি হবে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে  তিনি নগরবাসী সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছেন। 

 

বায়ান্ন/প্রতিনিধি/পিএ

 

 



সম্পর্কিত খবর