ঢাকা

গাজীপুর মহাসড়কে ‘মরণযান’ তাকওয়া পরিবহন, থামছে না দুর্ঘটনা, বাড়ছে জনক্ষোভ

গাজীপুরের সড়কে দীর্ঘদিন ধরে অনিরাপদ যাত্রা, বেপরোয়া চালনা ও একের পর এক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হিসেবে অভিযুক্ত তাকওয়া পরিবহন। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক এবং নিয়ম ভঙ্গের কারণে এ পরিবহনটি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘মরণযান’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বারবার প্রাণহানির ঘটনায় জনমনে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

 

সর্বশেষ গত ৫ এপ্রিল বিকেলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রডবাহী ট্রাকের পেছনে তাকওয়া পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী মিনিবাসের ধাক্কায় অন্তত তিনজন নিহত হন এবং আহত হন আরও ১৫ জন। এ ঘটনায় প্রায় এক ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এরই প্রেক্ষিতে ১৩ এপ্রিল গাজীপুর চৌরাস্তায় জাগ্রত চৌরঙ্গীর নিচে তাকওয়া পরিবহন বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ছাত্র সংগঠন। সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, তাকওয়া পরিবহনের বেপরোয়া গতি ও আইন অমান্যের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত হুমকির মুখে পড়ছে। সমাবেশে গাজীপুর মহানগর ছাত্র শক্তির সংগঠক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী অংশ নেন। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে এ পরিবহন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।

 

অভিযোগ উঠেছে, তাকওয়া পরিবহনের মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি সুলতান আহমেদ সরকার। দলীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর পরিবহন ব্যবসা করছেন তিনি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে থাকলেও সুলতানের হাতেই চাবিকাঠি। ঢাল হিসেবে রেখেছেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও গাজীপুর মহানগর শ্রমিকদলের আহ্বায়ক ফয়সাল সরকারকে। পরিবহনটির মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়ায় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হচ্ছে। অতীতে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ পরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় প্রাণহানির এ মিছিল থামানো সম্ভব হবে না।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাকওয়া পরিবহনের বিরুদ্ধে শুধু সড়ক দুর্ঘটনাই নয়, যাত্রী নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ও নারী নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে চলন্ত বাস থেকে ফেলে এক পোশাক শ্রমিককে হত্যার অভিযোগ ওঠে। একই বছরের জুলাইয়ে ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে এক যাত্রীকে বাস থেকে ফেলে দিয়ে পিষে হত্যার ঘটনাও ঘটে। এছাড়া ২০২০ সালে চলন্ত বাসে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ এক অটোরিকশাচালককে নৃশংস ভাবে হত্যার ঘটনায়ও মামলা নিতে গড়িমসি করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে স্থানীয়দের সড়ক অবরোধের মুখে মামলা গ্রহণ করা হয়। তবে ঘটনার পরও স্বাভাবিক ভাবেই চলাচল করছে তাকওয়া পরিবহনের বাসগুলো।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন গাজীপুরের বিভিন্ন সড়কে তাকওয়া পরিবহনের দুই শতাধিক মিনিবাস চলাচল করে। অধিকাংশ যানবাহনই চলাচলের অনুপযোগী। চালকদের অনেকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। তারা পাল্লাপাল্লি করে গতি বাড়ায় এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায়, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

 

গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ সরকার বলেন, আমি তাকওয়া পরিবহন দেখাশোনা করি না। কিছুদিন আগে রাস্তায় দুর্ঘটনার পর আমি মালিকদের ডাকিয়ে বলেছি ড্রপ টেস্ট ছাড়া গাড়ি চালাইতে পারবে না এই সিদ্ধান্ত আমি দিছি যারা দায়িত্ব পালন করে তাদের সহযোগিতা করছি। আমি কোন দায়িত্বে নেই আমি কোন মালিকও নই। আওয়াল ও ক্যাপ্টেন তারা দায়িত্ব পালন করছে।

 

ঘটনা অস্বীকার করে গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের দায়িত্বরত মো. হোসেন বলেন, আমরা ফয়সাল ভাইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী শ্রমিকদের ড্রপ টেস্টের আয়োজন করবো। এছাড়া আমরা যারা গাড়ির মালিক তারা অদক্ষ ড্রাইভার, হেলপারদের গাড়ি দেই না

 

বিআরটিএ গাজীপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাছাড়া আমি মিটিংয়ে বলবো তাদের বিরুদ্ধে তৎপরতা বাড়াতে।

 

এবিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (ট্রাফিক) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার অমৃত সূত্রধর বলেন, গাড়ির পরিমাণ বেশি এর জন্য ধীরে ধীরে গাড়ির কাগজপত্র চেক করা হচ্ছে তাছাড়া তাকওয়া পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে।



সম্পর্কিত খবর