শিক্ষা

জাবিতে ভর্তিকৃতদের শতকরা ১১ জনই কোটায়, সংস্কারের দাবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) মোট আসন সংখ্যার বড় একটি অংশ বিভিন্ন কোটায় ভর্তি হয়ে থাকে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে শতকরা ১১ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে কোটায়। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে কোটার যৌক্তিক সংস্কার।

শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবি ঘিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছেন সাঈদ-মুগ্ধরা। ঝরে গেছে আরো অনেক প্রাণ। এ সময়ে কোটার ক্ষেত্রে এ অবস্থা কাম্য হতে পারে না। অথচ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও জোরালো আন্দোলন হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। 

শিক্ষার্থীদের দাবি, ভিসি কোটা বাতিল করতে হবে, সিবলিঙ্ক কোটা বাতিল করতে হবে। এছাড়া পোষ্য কোটার ক্ষেত্রে পাশ মার্ক ৫০ % করতে হবে। বর্তমানে পোষ্য কোটায় একজন শিক্ষার্থী ৮০ নম্বরের মধ্যে ২৮ পাশ মার্ক পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য বলছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া ২ হাজার ১৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিভিন্ন কোটায় ভর্তি হয়েছেন ২২৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ১০১ জন, পোষ্য কোটায় ৫৩ জন, নৃগোষ্ঠী কোটায় ৩০ জন এবং উপাচার্য কোটায় ২০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। ভিন্নভাবে সক্ষম কোটায় ৭ জন করে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া খেলোয়াড় কোটায় ৬ জন ছেলে বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি হন। 

বিভাগ ভিত্তিক ভর্তির তথ্যমতে, কলা ও মানবিকী অনুষদে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন কোটায় ভর্তি হয়েছেন। এ অনুষদে কোটায় ভর্তি হয়েছেন ৮৫ জন। ইতিহাস ও দর্শন বিভাগে সর্বোচ্চ ১৭ জন করে শিক্ষার্থী কোটায় ভর্তি হয়েছেন। সবচেয়ে কম চারুকলা এবং নাট্য ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে ৩ জন করে। জীববিজ্ঞান অনুষদে বিভিন্ন কোটায় ৪৮ জন ভর্তি হয়েছেন। এ অনুষদের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ এবং পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেট্রিক্স বিভাগে ৯ জন করে কোটায় ভর্তি হয়েছে। 

গাণিতিক ও পদার্থ বিষয়ক অনুষদে ৩২ জন শিক্ষার্থী কোটায় ভর্তি হয়েছে। এ অনুষদে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তি হন। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ২০ জন শিক্ষার্থী কোটায় ভর্তি হয়েছে। সমাজবিজ্ঞান অনুষদে সবচেয়ে কম কোটায় ভর্তি হয়েছে। এ অনুষদে ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে ১৭ জন কোটায় ভর্তি হয়েছেন। এছাড়াও আইন অনুষদে ৪ জন, ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ৬ জন, ইন্সটিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজিতে ২ জন এবং তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটে ১০ জন কোটায় ভর্তি হয়েছে। 

কোনো কোটা থাকা উচিত নয় দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আমিরুল ইসলাম বলেন, জাবির ভর্তি পরীক্ষায় উপাচার্য কোটা ও পোষ্য কোটা একদমই থাকা উচিত নয় বলে আমি মনে করি। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে অনেকে ৫০-৬০ নম্বর পেয়েও ভর্তির সুযোগ পায়নি কিন্তু পোষ্য ও উপাচার্য কোটায় নামমাত্র মার্কস নিয়ে অনেকে তুলনামুলক ভালো ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি একটি সুশৃঙ্খল ও মেধাভিত্তিক ভর্তি প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার পথে বাধা। এই কোটা পদ্ধতি দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে প্রকৃত মেধাবীদের বঞ্চিত করে। আমি চাই উপাচার্য কোটা ও পোষ্য কোটা সম্পূর্ণ বাতিল করে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার করা হোক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য ইনস্টিটিউটের ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, জুলাই বিপ্লবের শুরুটা হয়েছিলো বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধেই। আমাদের আন্দোলনের শুরু থেকে আমাদের অন্যতম স্লোগান ছিল: কোটা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক। কিন্তু চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি বাতিল হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এখনো কোটা পদ্ধতি রয়েছে ব্যাপক ভাবে। আমরা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষাগুলোতেও কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিসি কোটা বাতিল, মুক্তিযোদ্ধার নাতি নাতনি কোটা বাতিল এবং পোষ্য কোটার যৌক্তিক সংস্কার। ভর্তির ক্ষেত্রেই যদি মেধার মূল্যায়ন করা না হয় তাহলে মেধাভিত্তিক দেশ গঠনের স্বপ্ন পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন ব্যাচের ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাব্য ডেট দেওয়া হয়েছে। এর আগেই যদি কোটা পদ্ধতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উপযুক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারে তাহলে আমার কিছুতেই আগের পদ্ধতি অনুসরণ করে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে দিবো না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড মুনির হোসেন তালুকদার বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের প্রথম শ্রেণির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের কোটাপদ্ধতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি চরম বৈষম্যের ও অন্যায়ের বহিঃপ্রকাশ। মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি তার পথে অন্তরায় এই ধরনের কোটা পদ্ধতি ৷ প্রয়োজনীয় কোটা ছাড়া বাকি সকল কোটা সংস্কার করা বা ক্ষেত্র বিশেষে বাতিল করা সম্ভব হলে সবচেয়ে ভালো। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এই বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে মেধাভিত্তিক দেশ বিনির্মাণে অগ্রসর হতে।

উল্লেখ্য যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির কোটা সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করলেও প্রশাসন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন আসায় তারা ভর্তি কোটা সংস্কারের দাবিতে ফের সরব হয়েছেন। অভ্যুত্থানের পরে গত ১৪ নভেম্বর ও ১ ডিসেম্বর তারা এ দাবিতে মানববন্ধনও করেন। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে মুক্তিযোদ্ধার নাতি নাতনিদের কোটা বাতিল করা হয়েছে।

 

বায়ান্ন/প্রতিনিধি/পিএইচ



সম্পর্কিত খবর