দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে দাবি করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিরোধী দল গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করুক, এতে আপত্তি নেই। তবে কর্মসূচির নামে দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করার দায়ও তাদের নিতে হবে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি আয়োজিত পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার বিরুদ্ধে মিছিল-পূর্বক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রিজভী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বিরোধী দল ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।
তবে এভাবে রাজনীতি করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, আপনারা রাজনীতি করছেন, করেন।
পার্লামেন্টে কথা বলেন, বাইরেও কথা বলেন, আপত্তি নেই। কিন্তু দেশকে অস্থিতিশীল করার দায় কী আপনাদের নয়?
তিনি বলেন, গণতন্ত্রে সংসদের ভেতরে-বাইরে কথা বলা যায়।
বিরোধী দল কর্মসূচি করছে, করুক। তবে হুমকি-ধমকি, মিথ্যাচার, অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়।
জ্বালানি সংকটের মধ্যে ৪৫০টি গাড়ি নিয়ে রংপুরে লংমার্চ করার সমালোচনা করে রিজভী বলেন, যমুনা ব্রিজের যেখানে টোল আদায় করা হয়, তার রিপোর্ট অনুযায়ী ৪৫০ গাড়ি নিয়ে তারা রংপুরে গেছেন। এই ৪৫০ গাড়ির জ্বালানি কত লেগেছে?
তিনি বলেন, যখন জ্বালানির অভাবে জাতীয় গ্রিডে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ দেওয়া যাচ্ছে না, ডিজেল সরবরাহে সংকট রয়েছে এবং জ্বালানির অভাবে দেশের অনেক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে, তখন এতগুলো গাড়ি নিয়ে লংমার্চ করার কী প্রয়োজন ছিল। ওই জ্বালানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে জনগণের উপকার হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের বিকল্প প্রস্তাব কী, সেই প্রশ্নও তোলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। রিজভী বলেন, বিরোধী দল আগামীতে সরকার হতে পারে। তাই বর্তমান সংকট কীভাবে মোকাবিলা করবে, তার প্রস্তাবও তাদের দিতে হবে।
জ্বালানি সংকটকে বর্তমান সরকারের একক সমস্যা হিসেবে দেখার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই সংকট তারেক রহমানের সংকট নয়, এটা বিএনপি সরকারের সংকট নয়। আপনারা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন। মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ হচ্ছে, যারা এতে জড়িত তাদের জিজ্ঞেস করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ জ্বালানি, এলএনজি ও ডিজেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ওই পথ বন্ধ থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার বাজেটের বাইরে আরও ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে গ্যাস ও এলএনজি আনার উদ্যোগ নিয়েছে। একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি ঠিক হওয়ায় গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি করছে বলেও জানান তিনি।
দেশ অস্থিতিশীল করার বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, মধ্যবাড্ডা, কাফরুল ও মিরপুরে বাসে আগুন এবং হাইকোর্টের সামনে বোমাবাজির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তার উত্তর দিতে হবে।
একটি ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জামায়াতের লোক বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে– দাবি করে তিনি জামায়াত আমিরের প্রতি প্রশ্ন তোলেন। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনায়ও প্রতিবাদ জানাতে জামায়াতের আমিরকে লংমার্চ করার আহ্বান জানান তিনি।
এক দফার আন্দোলনের প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, আপনাদের এক দফার কথা শুনে আমরা কি গলি দিয়ে পালাব, না প্রাচীরের ওইপারে আমরা লাফ দেব?
রিজভী বলেন, যে দলের সম্পর্ক রাজপথের ইট, কাঠ, ধুলা ও বালুর সঙ্গে, সেই দল বিএনপি। ১৭ বছর ধরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি আন্দোলন করেছে। জুলাইয়ের আন্দোলন ও আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনও দীর্ঘদিনের সেই আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করেন তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আছে ক্ষমতার জোরে নয়, জনগণের শক্তির জোরে। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, ২৫ হাজার কোটি গাছ লাগানো, হৃদরোগীদের রিংয়ের দাম কমানো এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ জনগণের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।
রিজভী আরও বলেন, বিএনপির খুঁটি কোনো বাঁশের খুঁটি নয়, বিএনপির খুঁটি জনগণের খুঁটি। ওই জনগণের খুঁটির ওপর বিএনপি দাঁড়িয়ে আছে। এই খুঁটি এত শক্ত যে হিমালয় পর্বতের শক্তি দিয়ে আঘাত করলেও এই খুঁটি নড়ানো যাবে না।
মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনুর সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব হাবীব উন নবী খান সোহেল, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান, কামরুজামান রতন প্রমুখ।
সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিলটি বিজয়নগর নাইটএ্যাঙ্গেল মোড় ঘুরে পুনরায় বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়।