রাজনীতি

কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রে ফেরার ভোট আজ

আজ বৃহস্পতিবার কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রে ফেরার ভোট। এক সঙ্গে দুটি ভোট। একটি বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোট। আজকের দিনটিই ভোটারদের। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের আজকের মতামতের ওপর নির্ভর করবে কারা সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে। কোন রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠন করবে। গণভোটের ইতিবাচক ফলাফলের বাধ্যবাধকতায় সংবিধান সংশোধন হবে, নাকি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। এ নির্বাচনে ৫০টি নিবন্ধিত দল অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে বিএনপি ও জামায়াত।

ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যেই মূল লড়াই হচ্ছে।

 

 

আজকের দিনটিই ভোটারদের। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের আজকের মতামতের ওপর নির্ভর করবে কারা সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে। কোন রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠন করবে। গণভোটের ইতিবাচক ফলাফলের বাধ্যবাধকতায় সংবিধান সংশোধন হবে, নাকি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। এ নির্বাচনে ৫০টি নিবন্ধিত দল অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে বিএনপি ও জামায়াত।

 

ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যেই মূল লড়াই হচ্ছে। এক সঙ্গে দুটি ভোট হওয়ার কারণে আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই সময়ের পরও যেসব ভোটার ভোটকেন্দ্রে থাকবেন, তাঁদের ভোট নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোটের ফলাফল ঘোষণায় দেরি হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা আশা করছি, শুক্রবার সকালের মধ্যে ফল ঘোষণা করে ফেলতে পারব।’ দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে আজ ভোট গ্রহণ করা হবে। এই ২৯৯টি আসনের মোট ভোটার ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪১৬ জন। বাকি একটি আসন শেরপুর-৩-এ একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। আসনটির ভোটকেন্দ্র ১২৮টি। ভোটার চার লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। এই আসনের নির্বাচনে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হবে। এই অবস্থায় শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী নিয়ে গঠিত এই আসনের ভোটাররা এবার সরকার গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ না-ও পেতে পারেন। তাঁদের ভোট প্রদানের আগে কোনো দল বা জোট প্রয়োজনীয় আসন পেলে সরকার গঠনের কাজ সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে। ভোট শুধু অধিকার নয় দায়িত্ব : গতকাল সন্ধ্যায় দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এই নির্বাচনে ভোটদান আমাদের শুধু নাগরিক অধিকারই নয়, বরং দায়িত্ব। আমি আশা করি আপনারা সবাই সচেতনভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন।’ রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার্থে সবাই দায়িত্বশীল ও যত্নবান হবেন। ভিন্নমত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি স্বাভাবিক বিষয়। এ বিষয়টি স্মরণে রেখে আপনারা উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে আসবেন, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে জয়-পরাজয়কে মেনে নেবেন।’ এর আগে গতকাল বুধবার সকালে তিনি ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে জানান, নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচন ‘অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য’ করার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। ৪৫টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ৩৩০ জনের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ২২০ জন ইউরোপীয় ইউনিয়নের। আরো আছেন ১৬০ জনের বেশি বিদেশি সাংবাদিক। দেশের অভ্যন্তরে ৮১টি নিবন্ধিত সংস্থার ৪৫ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক থাকছেন। এ ছাড়া দেশের ৬০ হাজারের বেশি সাংবাদিককে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের গোপনীয়তা বজায় রেখে গণমাধ্যমকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশাধিকার থাকছে এবং নির্বাচনের পর পর্যবেক্ষকরা তাঁদের পর্যবেক্ষণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারবেন। উল্লেখ্য, গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের অনেক ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন মর্মে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটসহ ২৮ দল ভোট বর্জন অথবা ভোটের মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়। অংশ নেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা দলগুলোসহ ১২টি দল। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ভোট গ্রহণ হয় ১৪৭ আসনে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, ওই ১৪৭টি আসনেও ব্যালট পেপার ছিনতাই ও বিভিন্ন সহিংস ঘটনার কারণে মোট ৫৯৬টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মাত্র চারজন বিদেশি পর্যবেক্ষক এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ওই সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল না। কারণ, এতে সব দলের সমান সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সমান সুযোগ না পাওয়ার মূল কারণ ছিল, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা ও দমন-পীড়ন। বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে হামলা ও তাঁদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। এর পরও ওই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে এবং আদালতের ভূমিকাও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করে। নির্বাচনের ফলাফলও হয় প্রায় একতরফা। নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল থেকে জানা যায়, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ এবং এক হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে ৯৬ শতাংশের ওপরে ভোট পড়েছে, যা অস্বাভাবিক। আরো দেখা যায়, ৭৫টি আসনের ৫৮৭টি কেন্দ্রের সব (১০০%) বৈধ ভোট শুধু একজন করে প্রার্থী পেয়েছেন। অন্য কোনো প্রার্থী একটি ভোটও পাননি। এই ৫৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৬টিতে (৯৯.৮৩) সব ভোট পেয়েছিলেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। এসব তথ্য বিশ্লেষণে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন, এটি ছিল নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন। এতে আবারও প্রমাণিত হয়, নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এবং দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনও হয় দলীয় সরকারের অধীনে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ থাকে। বিরোধী কোনো দল ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এর ফলে নির্বাচনটি ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন নামে অবিহিত হয় এবং এর ছয় মাস পরই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যে ১০টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না : নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে এবার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগসহ ১০টি দল অংশ নিচ্ছে না। অন্য ৯টি দল আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। দলগুলো হলো—বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা, জাসদ, তরীকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বিএনএফ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। সাড়ে ১১ লাখ ভোটারের ভোট সম্পন্ন : নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য মোট সাত লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পোপার পাঠানো হয়। এর মধ্যে গ্রহণ করেছেন পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯৯ জন। ভোট দিয়েছেন পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ২১৪ জন। ভোট দেওয়া ব্যালট গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দেশে এসে পৌঁছেছে চার লাখ ৯১ হাজার ৬১৫টি। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা গ্রহণ করেছেন চার লাখ ৬৬ হাজার ২৪৩টি। প্রবাসী ভোটার ছাড়াও একই সময়ের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কারাগারে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে মোট ছয় লাখ ২৬ হাজার ১৪৯ জন ভোট দান সম্পন্ন করেছেন। সব মিলিয়ে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ১১ লাখ ৫৭ হাজার ৩৬৩ জন ভোটার তাঁদের ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন। ৭৮ আসনে নারী ভোটার বেশি : এবারের ভোটার তালিকায় ৩০০টি আসনের মধ্যে ৭৮টি আসনে পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি রয়েছেন। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ এলাকার আসনগুলোয় ভোটারদের মধ্যে নারী ভোটার বেশি। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে পাওয়া আসনভিত্তিক ভোটার তথ্য থেকে এই হিসাব মিলেছে। যেসব আসনে নারী ভোটার বেশি সেগুলো হলো—ঠাকুরগাঁও-১, দিনাজপুর-৫ ও ৬, রংপুর-৩, ৪, ৫ ও ৬, কুড়িগ্রামের চারটি আসনের সব, গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের সব, জয়পুরহাটের দুটি আসনের সব, বগুড়ার সাতটি আসনের মধ্যে ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর আসন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন, নওগাঁর ছয়টি আসনের মধ্যে ১, ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর আসন, রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে ১, ২, ৩ ও ৬, নাটোরের চারটি আসনের সব, সিরাজগঞ্জ-১ ও ৪ নম্বর আসন, পাবনা-৪ আসন, মেহেরপুর-২ আসন, কুষ্টিয়া-৩ আসন, চুয়াডাঙ্গা-১ আসন, ঝিনাইদহ-২ আসন, যশোর-১ ও ৪, মাগুরা-১, নড়াইল-২, বাগেরহাট-১ ও ২, খুলনা-১, ২, ৪ ও ৫, সাতক্ষীরা-১ ও ২, বরগুনা-১ ও ২, পিরোজপুর-১, টাঙ্গাইল-৮, জামালপুর-৪ ও ৫, শেরপুরের তিনটি আসনের সব, ময়মনসিংহ-১, ৪ ও ১১, ঢাকা-২০, গাজীপুর-১, ২, ৩ ও ৪, নরসিংদী-৪ এবং ফরিদপুর-৩ নম্বর আসন। সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো আসনেই পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি না। কক্সবাজার-৩ আসনে নারীর তুলনায় পুরুষ ভোটার সবচেয়ে বেশি। এই আসনে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৯১ হাজার ৯৯ জন। আর নারী ভোটার দুই লাখ ৫৪ হাজার ৮৬২ জন।" height="136" src="https://asset.kalerkantho.com/public/news_images/share/photo/shares/1.Print/2025/02.February/12-01-2026/mk/kk-NEW-1-2026-02-12-01a.jpg" class="page_speed_1164741535" width="300" />এক সঙ্গে দুটি ভোট হওয়ার কারণে আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই সময়ের পরও যেসব ভোটার ভোটকেন্দ্রে থাকবেন, তাঁদের ভোট নেওয়া হবে।

 



সম্পর্কিত খবর