বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। করোনা মহামারির আগে থেকেই অর্থনীতির নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট ছিল। ২০২০ সালে মহামারি, ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দা এবং ডলার সংকট মিলে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। এর মধ্যে এক চিন্তাজনক প্রবণতা হলো দেশের পুঁজি বিদেশে সরানো, যা বৈধ ও অবৈধ- উভয় মাধ্যমেই বেড়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা (২ কোটি ডলার) বিদেশে পাঠানো হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই পরিমাণ ৬০ শতাংশ বেশি। পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ। একই সময়ে অবৈধ পথে আরও বহু গুণ বেশি পুঁজি পাচার হয়েছে বলে অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতিবছর ১,৬০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে।
গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি পুঁজি গেছে ভারতে (৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার)। এর পর রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (১ কোটি ৮ লাখ ডলার) এবং আয়ারল্যান্ড (১৩ লাখ ডলার)। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা প্রধানত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (৭ কোটি ১ লাখ ডলার) এবং খনিজ খাতে (৯৪ লাখ ডলার) বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া টেক্সটাইল, সেবা ও বাণিজ্য খাতে কিছু বিনিয়োগ হয়েছে।
আগে বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের অনুমোদন ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত আকারে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। বৈধ বিনিয়োগের বেশিরভাগই আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও কারখানা স্থাপনে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু বৈধ বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলক কম। বিপুল অঙ্কের পুঁজি অবৈধভাবে পাচার হচ্ছে।
বিদেশে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যে মুনাফা করে, তা থেকে নতুন বিনিয়োগের প্রবণতা কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা থেকে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৫.৭ শতাংশ কম।
বিদেশে কার্যকর কোম্পানিগুলোর মধ্যে ঋণ পরিশোধের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছরে ৩ কোটি ২৪ লাখ ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৩.৪ শতাংশ বেশি। ফলে নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ হয়নি।
অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ডলার সংকটকে উপেক্ষা করে দেশে পাচার ও বিনিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কমলেও দেশের উদ্যোক্তাদের পুঁজির স্থিতি ৩২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার দাঁড়িয়েছে।
গভীর অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিদেশে সরিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
* বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান পরিবার
* এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম মাসুদের পরিবার
* সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের পরিবার
* নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারের পরিবার
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে দেশের ব্যর্থতা স্পষ্ট। গত ৩ অর্থবছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ধারাবাহিকভাবে। গত অর্থবছরে বিদেশি পুঁজির আগমন কমেছে ৫.৯৮ শতাংশ, যা অর্থনৈতিক মন্দাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দেশ থেকে পুঁজি পাচার ও বৈদেশিক বিনিয়োগের সঠিক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা এবং আইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ডলার সংকট মোকাবিলা, পাচার রোধ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ডলার সংকট এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর মধ্যে পুঁজি পাচার দেশের জন্য এক বিপর্যয় ডেকে আনছে। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বায়ান্ন/এসএ